Take a fresh look at your lifestyle.

দুয়োরানির ছেলে!

0 307
জাতীয় দলের হয়ে সর্বশেষ ১৫ ওয়ানডেতে তাঁর ব্যাটিং গড় ৪৭.৯৭। তবু ইমরুল নিয়মিত নন একাদশে! ২০১৫-র নভেম্বর থেকে গত প্রায় দুই বছরে খেলেছেন এই ১৫টি ম্যাচ। এই একই সময়ে বাংলাদেশ খেলেছে ৩৭টি ওয়ানডে। অর্ধেকেরও বেশি ওয়ানডেতে ইমরুল সুযোগ পাননি। ইমরুলের কি মনে হয় না, যতটা প্রাপ্য ছিল, তার অনেকটাই পাননি? সে শুধু তারকাখ্যাতিতে নয়; জাতীয় দল থেকে পাওয়া সমর্থনেও

আগামী মাসে জাতীয় দলের হয়ে খেলার এক দশক পূর্ণ হবে তাঁর। এত দিন ধরে খেলছেন, তবু কি ইমরুল কায়েস প্রাপ্য তারকাখ্যাতি পেয়েছেন? জাতীয় দলে আসা তরুণটাও যেভাবে মেগা স্টার হয়ে ওঠে, সেই তুলনায় ইমরুল এখনো যেন অনেকটাই সাদামাটা। পেছন ফিরে তাকিয়ে ইমরুলের কি অভিমান হয় না? মনে হয় না, যতটা প্রাপ্য ছিল, তার অনেকটাই পাননি? তা শুধু তারকাখ্যাতিতে নয়; জাতীয় দল থেকে পাওয়া সমর্থনেও।

জাতীয় দলের হয়ে সর্বশেষ ১৫ ওয়ানডেতে তাঁর ব্যাটিং গড় ৪৭.৯৭। এ সময় ৬ ইনিংসে অন্তত ৫০ পেরিয়েছেন। একটি সেঞ্চুরিও আছে। তবু ইমরুল নিয়মিত নন একাদশে! ২০১৫-র নভেম্বর থেকে গত প্রায় দুই বছরে খেলেছেন এই ১৫টি ম্যাচ। এই একই সময়ে বাংলাদেশ খেলেছে ৩৭টি ওয়ানডে। অর্ধেকেরও বেশি ওয়ানডেতে ইমরুল সুযোগ পাননি। টেস্ট দলের ওপেনার হিসেবেই ইমরুলকে থিতু করতে চেয়েছে বাংলাদেশ। ওয়ানডেতে সৌম্য সরকারকেই ভাবা হয়েছে তামিম ইকবালের সঙ্গী। ভাবনাটি ভুল ছিল, নাকি সঠিক, সে নিয়ে তর্ক হতে পারে। তবে ইমরুল দাবি করতেই পারেন, প্রাপ্য সুযোগ অন্তত তাঁকে দেওয়া হয়নি।

অথচ যখনই সুযোগ পেয়েছেন, চেষ্টা করেছেন নিজের কাজটা ঠিকমতো করার। ঠিক গত ওয়ানডের মতো। ২০১৫-র নভেম্বরে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে দুই ওয়ানডেতে সুযোগ পেয়েই সত্তরের দুটি ইনিংস খেলেছেন। প্রায় এক বছর পর মাঝে আফগানিস্তানের বিপক্ষে তিন ওয়ানডের একটিতে খেললেন মাত্র। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজে প্রথম ওয়ানডে সেঞ্চুরি করলেন, তৃতীয় ওয়ানডেতে ৪৬। ডিসেম্বরে নিউজিল্যান্ড সফরেও তিন ইনিংসে মন্দ ছিল না তাঁর পারফরম্যান্স (১৬, ৫৯, ৪৪)।

এরপর শ্রীলঙ্কা সফরের ওয়ানডে সিরিজে খেলা হলো না। চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে দুই ম্যাচে সুযোগ পেয়ে ব্যর্থ হলেন। যদিও এই প্রশ্ন তুলতে পারলেন না, চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে ইংলিশ কন্ডিশনে খেলানোই যদি হবে, তাহলে এর আগে আয়ারল্যান্ডে যে প্রস্তুতিমূলক টুর্নামেন্টটা বাংলাদেশ খেলল, সেই চার ওয়ানডেতে কেন খেলানো হলো না। চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে শেষ দুই ম্যাচেও সুযোগ মিলল না।

দলীয় ভরাডুবির দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে তিন ওয়ানডেতে ৩১, ৬৮ ও ১ রান করার পর কোপটা তাঁর গর্দানেই পড়ল। এ বছরের শুরুতে দেশের মাটিতে হওয়া ত্রিদেশীয় সিরিজ, এরপর ওয়েস্ট ইন্ডিজেও ওয়ানডে সিরিজে সুযোগ মিলল না তাঁর। প্রাথমিক স্কোয়াডে থেকেও জায়গা পাননি এশিয়া কাপে। আর যেভাবে আকস্মিকভাবে উড়িয়ে নিয়ে নামিয়ে দেওয়া হয়েছিল টুর্নামেন্টের মাঝপথে, অচেনা ব্যাটিং পজিশনে, ব্যর্থ হলে তাঁর গর্দানটাই তাক করত সবাই।

সেই পরিস্থিতিতে দলের এশিয়া কাপ বাঁচানো অপরাজিত ৭২ রানের ইনিংস খেলেও অন্তত ম্যাচের দিন আড়ালে চলে গেলেন মাহমুদউল্লাহ আর মোস্তাফিজের কারণে। ভাগ্যিস কাল সংবাদ সম্মেলনে এসেছিলেন!

তবু ইমরুলের আক্ষেপ নেই। কারণ ইমরুল জানেন, হয়তো তবুও দলে পাকা নয় তাঁর জায়গা। এখনো বাদ পড়ার কথা ভাবলে সবার আগে তালিকায় হয়তো উঠবে তাঁর নাম। আগের ম্যাচের ইনিংসটা তাঁর ক্যারিয়ারের টার্নিং পয়েন্ট কি না, এমন প্রশ্নের জবাবেও ইমরুলের তাই অস্ফুট উত্তর, ‘হতে পারে হয়তো। না-ও হতে পারে।’

আরব আমিরাতের গরম আর দলের অবস্থা মিলিয়ে আক্ষরিক অর্থেই যেন উত্তপ্ত কড়াই থেকে জ্বলন্ত উনুনে নামিয়ে দেওয়া হয়েছিল তাঁকে। মুশফিকের রানআউট ভিলেন প্রায় বানিয়েই দিতে বসেছিল, যদিও সেই আউটে তাঁর দায় সামান্যই। ৮৭ রানে ৫ উইকেট হারিয়ে বাংলাদেশ তখন মরুর বুকে সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে এশিয়া কাপ থেকে নিজেদের বিদায়ও দেখছে। সেই অবস্থায় কী অবিশ্বাস্য এক জুটি গড়লেন মাহমুদউল্লাহর সঙ্গে।

হুড়-হুড়োক্কো ব্যাটিং এমনিতেই তাঁর ডিএনএতে নেই, স্ট্রোক যদিও খেলতে পারেন যথেষ্টই। ওই যে, টেস্ট ওপেনারের তকমা এমনি তো লাগেনি। পরিস্থিতির কারণে আরও খোলসে ঢুকতে বাধ্য হলেন। পরিস্থিতিই তাঁকে ডট বল খেলতে বাধ্য করছিল। সে সময় যেন ভেতরে-ভেতরে পুড়ছেন। না হলে মাহমুদউল্লাহকে কেন বারবার বলবেন, বেশি বেশি ডট বল খেলে ফেলছেন না তো!

‘আমি আর রিয়াদ ভাই একটা জুটি গড়ার কথাই ভাবছিলাম। উনি আমাকে অনেক সাহায্য করেছেন ব্যাটিংয়ে। আমি তাঁকে অনেক কৃতিত্ব দেব। একটা সময় আমার মনে হচ্ছিল, অনেক ডট বল দিচ্ছি। তাঁকে বারবার জিজ্ঞেস করছিলাম, আমি কি অনেক ডট বল খেলছি? উনি আমাকে বলেছেন, “তুই যেমন খেলছিস, সেভাবেই খেলতে থাক। অসুবিধা নেই, আমরা শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করব”’, বলেছেন ইমরুল।

এমনকি যে পজিশনে খেলতে একেবারে অভ্যস্ত নন, সেখানে খেলেও কোনো আপত্তি নেই তাঁর। ওপেনারের বিকল্প হিসেবে উড়িয়ে নিয়ে গিয়েও যে ৬ নম্বরে নামতে হলো, এটাকেও স্বাভাবিকভাবে নিয়েছেন। বরং দলের হয়ে পাল্টা যুক্তিও দিলেন, ‘আমার মনে হয় ওপেনিং ব্যাটসম্যানরা যখন বড় ইনিংস খেলতে থাকে, তখন তারা সব পরিস্থিতে ব্যাটিং করার মতো উপযুক্ত হয়ে ওঠে। কেননা লম্বা ইনিংসে খেলতে হলে ওপেনারদের শুরুতে, মাঝে ও ডেথ ওভারে খেলতে হয়। এ কারণে আমার ব্যক্তিগতভাবে মনে হয় না ৬ কিংবা ৪ নম্বর নিয়ে কোনো সমস্যা আছে। আমি যখন ব্যাটিংয়ে নেমেছিলাম, আমার কাছে মনে হয়েছে আমি বলের মেরিট দেখে খেলব, পরিস্থিতি অনুযায়ী খেলব। ওভাবেই চেষ্টা করেছি।’

কিন্তু প্যাড পরে ড্রেসিংরুমে বসে থাকা, এটাও তো তাঁর জন্য আনকোরা অভিজ্ঞতা। মাঝখানে একটু টেনশনে পড়ে গিয়েছিলেন, স্বীকার করলেন, ‘স্বাভাবিকভাবে আমি যখন বাইরে বসে থাকি প্যাড পরে, খুব টেনসড থাকি। এটা আমার ভেতর কাজ করে। গতকাল (পরশু) একটু নির্ভার ছিলাম। কারণ অনেক ব্যাটসম্যানের পরে আমাকে নামতে হচ্ছে। কিন্তু যখন ২-৩ জন আউট হয়ে গেল, তখন আর নির্ভার থাকা গেল না। অবশ্যই আমি ওপেনিং ব্যাটসম্যান। সারা ক্যারিয়ারেই ওপেন করে আসছি। প্রত্যেকটা ব্যাটসম্যানেরই একটা মাইন্ড সেটআপ থাকে যে আমি এভাবে খেলব। আমি হয়তো বা ভিন্ন পজিশনে ভিন্নভাবে খেলার চেষ্টা করে গেছি।’

পরের ম্যাচে হয়তো নিজের চেনা পজিশনে ফিরবেন। না-ও ফিরতে পারেন। এ নিয়েও কোনো দাবি নেই ইমরুলের কণ্ঠে, ‘এটা আসলে আমার বিষয় না। এটা হচ্ছে ম্যানেজমেন্টের বিষয়। ম্যানেজমেন্ট যদি মনে করেন যে আমাকে এই জায়গাগুলোতে খেলাবে, আমি প্রস্তুত থাকব। সমস্যা নাই।’

‘সমস্যা’ থাকেই বা কী করে। সেই প্রশ্ন তোলারই তো অধিকার তাঁর নেই। তিনি যে দুয়োরানির ছেলে!

Leave A Reply

Your email address will not be published.