Take a fresh look at your lifestyle.

The advantage is just phone companies

0 140

আমাদের মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলোতে মূলত দুই ধরনের কলরেট চালু ছিল। অননেট, অর্থাৎ সেই কোম্পানিরই ফোনে আলাপ করা যেত বেশ সস্তায়। অন্যদিকে ভিন্ন কোম্পানির কোনো ফোনে, অর্থাৎ অফনেটে কথা বলতে কিছু বেশি খরচ হতো। গত ১৪ আগস্ট মধ্যরাত থেকে দেশের যেকোনো মোবাইল ফোনে কথা বলার রেট সমান করা হয়েছে। তার ন্যূনতম পরিমাণ প্রতি মিনিটে ৪৫ পয়সা, আর সর্বোচ্চ ২ টাকা। সর্বোচ্চ আগেও তাই ছিল। বিতর্ক হচ্ছে, এ ধরনের একক কলরেট ধার্য করার প্রয়োজন ছিল কি না, সেটা নিয়ে। মোবাইল ফোনের গ্রাহকদেরও এ নিয়ে কোনো দাবি ছিল না। বরং কয়েকটি কোম্পানি প্রতিযোগিতা করে উত্তরোত্তর ভালো সুবিধা দিয়ে যাচ্ছিল সাশ্রয়ী মূল্যে। এ সুযোগ থেকে আকস্মিকভাবে গ্রাহকদের বঞ্চিত করার সুবিধাটা কী হলো, তা দুর্বোধ্য।

সাধারণ দৃষ্টিতে দেখা যায়, মোবাইল ফোনে কথা বলার খরচ বেড়ে গেছে। আগেও তো সবাই অননেট-অফনেট উভয়ভাবেই নিজ নিজ প্রয়োজনমতো কথা বলতেন। তখন এত টাকা ব্যয় হতো না। বস্তুতপক্ষে এ দেশে ভোক্তাদের নামে দু-একটি দর-কষাকষির সংস্থা থাকলেও এদের কার্যক্রম অতি সীমিত। তা–ও তারা করেছে মানববন্ধন। বলছে এ কার্যক্রম অগণতান্ত্রিক ও অনৈতিক। রাজনৈতিক দলগুলোর মাঝে দুটি ছোট দলের বিবৃতি নজরে এসেছে। বাসদ কেন্দ্রীয় কমিটির এক নেতা বলেছেন, এতে বছরে গ্রাহকদের অতিরিক্ত ৬ হাজার কোটি টাকা বেশি ব্যয় হবে। সিপিডির একজন দায়িত্বশীল নেতার মতে, আগামী নির্বাচনের ব্যয় মেটাতে এ মূল্য বাড়ানো হয়েছে। তাঁদের বক্তব্যের ভিত্তিতে যথেষ্ট হিসাব-নিকাশ আর প্রমাণও হয়তো নেই। তবে একতরফাভাবে হঠাৎ করে এ ধরনের একক কলরেট ধার্য করায় সবাই বিস্মিত হয়েছে। আর সর্বনিম্ন রেট বেঁধে দেওয়ার পরিমাণটাও যৌক্তিক নয়, এটা লক্ষণীয়।

একজন গ্রাহক একই নম্বর রেখে অন্য অপারেটরের আওতায় চলে যাওয়ার জন্য নম্বর পোর্টেবিলিটির প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে একক কলরেট দরকার বলে যুক্তি দেওয়া হচ্ছে। হতে পারে। তবে নম্বর পোর্টেবিলিটির সুবিধার জন্য কয়েকজন গ্রাহক নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে আবেদন করেছেন, এটা জানা গেল না। এর সুফলই বা কী? আর একক কলরেট যদি করাই হয়, তবে সর্বনিম্ন যে ২৫ পয়সা প্রতি মিনিটের রেটটা ছিল, তা থেকে এতটা বাড়াতে হবে কেন? প্রকৃতপক্ষে নিয়ন্ত্রক সংস্থা সাধারণত কোনো পণ্যের সর্বোচ্চ দাম নির্ধারণ করে। ওষুধের ক্ষেত্রেও তাই লক্ষ করা যায়। মোবাইল ফোনের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ দামটা বেঁধে দিয়ে সর্বনিম্ন দামের বিষয়টি অপারেটরদের হাতে ছেড়ে দিলে একটা প্রতিযোগিতা থাকতে পারত। গ্রাহক টানতে কোনো কোনো কোম্পানি কম মূল্যের অফার দিত। লাভবান হতো ভোক্তারা। এসব সুযোগ গেল।

মোবাইল ফোনের ইতিহাস আমাদের দেশে দীর্ঘকালের নয়। ১৯৮৯ সালে প্যাসিফিক বাংলাদেশ টেলিফোন লিমিটেড নামক একটি কোম্পানিকে একচেটিয়া সুযোগ দেওয়ার মাধ্যমে এর সূচনা। সেট, সংযোগ ও কথা বলার রেট—সবই ছিল গলাকাটা হারে। উচ্চবিত্তের আওতাতেই ছিল সুবিধাটি। অন্যরা শুধু তাকিয়ে দেখত। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে এ সুযোগ ব্যাপকভাবে প্রসারিত হয়। প্রথমে গ্রামীণফোন, এরপর একটেল (এখন রবি) এবং তারপর এল বাংলালিংক। পরের দিকে রাষ্ট্রায়ত্ত খাতে টেলিটক নামে একটি কোম্পানিও হয়েছে। প্রথম তিনটিতে সিংহভাগ বিনিয়োগ বিদেশিদের। তাই তাদের লাভ বিদেশে যাচ্ছে। কিন্তু এর সুফলভোগী মধ্যবিত্তের সীমানা ছাড়িয়ে গেছে অনেক আগে। এখন নিম্নবিত্ত খেতমজুরের লুঙ্গির খুঁট এবং গৃহকর্মীর শাড়ির আঁচলেও রয়েছে মোবাইল ফোন। সেটের দাম রকমভেদে বেশি থেকে কম। সব শ্রেণি-পেশার আওতায় রয়েছে। সিম সংযোজন ফিও বেশ কম। কলরেট এত দিন একটি স্বস্তিকর পরিমাণে ছিল।

এ ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ রেগুলেটরি কমিশন (বিটিআরসি) কোন যুক্তিতে এ মূল্য বৃদ্ধি করল, তা দুর্বোধ্য। তাদেরই হিসাবমতে, জুলাই ২০১৮-তে অপারেটরভেদে মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা যথাক্রমে গ্রামীণ, রবি, বাংলালিংক ও টেলিটকে ৭ কোটি ২ লাখ, ৪ কোটি ৫৩ লাখ, ৩ কোটি ৩৪ লাখ এবং ৩৭ লাখ। মোট ১৫ কোটি ২৫ লাখ। সে বিটিআরসির হিসাবেই অননেট কল গ্রামীণ, রবি ও বাংলালিংকের যথাক্রমে ৯০, ৭১ ও ৬৯ শতাংশ। সহজ অঙ্কে ব্যবহারকারীদের বিশাল অংশকে স্বল্পসংখ্যক অফনেট কল একই হারে আনতে গিয়ে কলের দাম বাড়ল কমবেশি ৫০ শতাংশ। হারাহারিভাবে বাড়ল ভ্যাট। সেটা যাবে সরকারি কোষাগারে। তবে মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলোকে এ সর্বনিম্ন দামটা বেঁধে দিয়ে বড় ধরনের অতিরিক্ত মুনাফার সুযোগ দেওয়া হলো। মাশুল দেবে ব্যবহারকারীরা।

এটা অনস্বীকার্য এ কোম্পানিগুলোর প্রচেষ্টায় এ খাতে ব্যাপক কর্মসংস্থানের পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও সামাজিক খাতে বৈপ্লবিক অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। এটা এখন আমাদের প্রায় সব লোকের সর্বক্ষণের সঙ্গী। কথা বলা ছাড়াও খুদে বার্তা পাঠানো, টাকা লেনদেন, সেবাদানকারী সংস্থাগুলোর বিল পরিশোধ, এমনকি বিসিএস পরীক্ষার ফি দিতেও ব্যবহৃত হয়। সরকার পাচ্ছে বিপুল পরিমাণ কর ও রাজস্ব। পক্ষান্তরে এসব কোম্পানি করছে লাভ। তাদের ঊর্ধ্বতন নির্বাহীরা ভিন দেশের লোক। বেতনও পান অনেক টাকা। এমনই অবস্থায় নতুন কলরেট কাদের আগ্রহে এবং কেন হলো—এ প্রশ্ন বারবার আসবে। আর এতে মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীরা যে বস্তুত অন্যায্য বাড়তি ব্যয় বহন করবেন, এটা বলার অপেক্ষা রাখে না। উল্লেখ করা প্রাসঙ্গিক, উন্নত সেবার জন্য একটু বেশি ব্যয় করতে হয়। হতে পারে অননেট ও অফনেট কল একই ভিত্তিতে আনার প্রযুক্তিগত প্রয়োজন ছিল। তবে এর সুবিধাভোগী গ্রাহকের সংখ্যা বিবেচনায় সবার ঘাড়ে মূল্যবৃদ্ধির খাঁড়ার ঘা যৌক্তিক হয়নি।

আমাদের দুর্বল শাসনব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে বিভিন্ন মহল সরকার থেকে নানাবিধ সুযোগ নেয়। কিন্তু এর বিনিময়ে তাদের যে ছাড় দেওয়ার কথা, তা দেয় না। যেমন গত বাজেটে ইন্টারনেট সেবা প্রদানের ওপর ভ্যাটের হার ৫ শতাংশ হ্রাস করা হয়েছে। সরকারকে ছাড় দিতে হয়েছে অনেক টাকার রাজস্ব। অথচ এখন পর্যন্ত ইন্টারনেট সেবার ওপর ধার্যকৃত চার্জ অনেক ক্ষেত্রেই কমেনি এক পয়সাও। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, গ্রামীণফোনের ২৮ দিন মেয়াদি ৩ জিবি ডেটার হার ছিল ৪২৭ টাকা। এখনো তাই আছে বহাল তবিয়তে। তাহলে ভ্যাট ছাড়ের সুবিধা নিয়ে নিল ‘সেবা’ প্রদানকারী সংস্থা। তাদের খুঁটির জোর খুব শক্ত। জুলাই মাসের সূচনায় এসব চার্জ কমানোর জন্য অর্থমন্ত্রী কিছু হুমকি-ধমকি দিলেও অজ্ঞাত কারণে এখনো সবাই চুপসে গেছেন। বেসরকারি ব্যাংক বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সুদের হার এক অঙ্কে নামানোর প্রতিশ্রুতিতে বহু ধরনের সুবিধা নিল। আঙুলে গোনা দু-একটি ক্ষেত্রে গুটিকয় বেসরকারি ব্যাংক ছাড়া বাকি কেউ সে পথ মাড়াচ্ছে না। অথচ আমানতকারীদের মুনাফা ৬ শতাংশে সীমাবদ্ধ করে ফেলেছে। কেবল সরকারি ব্যাংকগুলো ঋণ দিচ্ছে ৯ শতাংশ সুদে। তারা লোকসানি বটে। তবে কোনো তারল্যসংকটে নেই।

মোবাইল ফোন কলরেট বৃদ্ধি করা প্রসঙ্গে ওপরের কথাগুলো এ দেশে বেসরকারি সেক্টরের কিছু হালচাল তুলে ধরার জন্য প্রাসঙ্গিক। অবশ্য তাঁরা উদ্যোক্তা। খাটো করে দেখা যায় না তাঁদের। তাঁরাই শিল্প-বাণিজ্যের প্রসার ঘটিয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে রাখছেন অবদান। তেমনি ইতিবাচক ভূমিকা রাখছেন কর্মসৃজনে। তবে সরকার থেকে দেওয়া সহায়তার সদ্ব্যবহার করা হয় না অনেক ক্ষেত্রে। মোবাইল ফোনের বিকাশ ঘটাতে সরকার বহু ধরনের ছাড় দিয়েছে। সে কোম্পানিগুলো তা করেছেও। তবে কলরেট নিয়ে সাম্প্রতিক ব্যবস্থায় তাঁদের ভূমিকা ছিল না, এমনটা মনে করার কোনো কারণ নেই। টেলিযোগাযোগ একটি ক্রমবিকাশমান খাত। এতে সব শ্রেণি-পেশার লোককে ধরে রাখতে হলে এর সেবার ব্যয় রাখতে হবে যৌক্তিক পর্যায়ে। মোটামুটি তাই ছিল। তবে হালের এ রেট বৃদ্ধিতে আমাদের সব ধারণা বেশ পাল্টে দিয়েছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় আরেকটু জনবান্ধব দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আবার বিষয়টি দেখতে পারে। কতটুকু সেবার জন্য কত বেশি ব্যয় করতে হবে, এ হিসাব খুব কঠিন নয়।

Leave A Reply

Your email address will not be published.